• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৬ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
“ভালো থেকো আমার না হওয়া মহারানী” চলন্ত ট্রাকে আড়াই ঘন্টা ঝুলে ৩২ লাখ টাকার ইয়াবা জব্দ করলেন সিপাহি জয়পুরহাট রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুই দিনব্যাপী কর্মশালা শুরু দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে বাসের ধাক্কা, নিহত বেড়ে ৪ ড্রাম ট্রাকের পেছনে যাত্রীবাহি বাসের ধাক্কা, নিহত ৩ সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার

ফেসবুক, হিন্দু বাড়িতে আগুন ও সাম্প্রদায়িকতা

।। চিরঞ্জন সরকার ।। সেই একই স্ক্রিপ্ট। একই স্টাইল, পুরনো কাহিনি। শুধু স্থান আর কালটা বদলে গেছে। প্রথমে এক হিন্দু যুবকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ। এর পর হিন্দু বিরোধী ক্যাম্পেইন। তারপর শুক্রবার জুমার নামাজের পর হাজার হাজার মানুষের সংগঠিত হওয়া। অভিযুক্ত এবং আশপাশের হিন্দুদের বাড়িঘরে আক্রমণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট। শেষ মুহুর্তে পুলিশের বাধা চেয়ার চেষ্টা। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ। একজন নিহত। গত কয়েক বছরে আমরা এ ধরনের ঘটনা কক্সবাজারের রামু, কুমিল্লার হোমনা, পাবনার সাঁথিয়া, সাতক্ষীরার ফতেহপুর, কুমিল্লার নাসিরনগরে ঘটতে দেখেছি। এবার দেখলাম রংপুরের গঙ্গাচরায়।

না, গোপনে কোনো হিন্দু বাড়িতে আগুন দেয়া কিংবা হামলা নয়, ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে বিক্ষোভ করেছে। তারা সম্মিলিতভাবে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করেছে!আলমগীর হোসেন নামে একজন মুদি দোকানী টিটু রায় নামে এক হিন্দু যুবকের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে গত ৫ নভেম্বর থানায় মামলা করেছেন। এরপর আরও পাঁচদিন অতিক্রান্ত হয়েছে। কিছু মানুষ একটু একটু করে ওই হিন্দু যুবকের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে। অনেক মানুষ সেই প্রচারণায় বিশ্বাস স্থাপন করেছে। তারা ‘পবিত্র শুক্রবারের’ জন্য অপেক্ষা করেছে। প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক দল কিছুই টের পায়নি! আসলে টের পাবার চেষ্টাও করেনি!

হিন্দুর বাড়িঘর জ্বললে, তারা দেশ ছেড়ে চলে গেলে এদেশে কার কী আসে যায়?আমাদের দেশের মানুষ আশ্চর্য স্ববিরোধিতা দিয়ে গড়া। এখানে সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষ এবং ‘মানুষ মানুষের জন্য’ বলে কিছু মানুষের আন্তরিক আকুতি প্রায় একইসঙ্গে চলে। অসাম্প্রদায়িকতা প্রশংসা ও প্রয়োজনীয়তা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন, নির্যাতন ও বৈষম্যমূলক আচরণ এখানে একই সঙ্গে চলে। এখানে ‘গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান, মিলিয়া…’ গানটি খুবই জনপ্রিয়, আবার ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ করার জন্য লোকের অভাব হয় না।

এখানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘মোরা একই বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’ কিংবা ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!. . .’ কবিতা আবৃত্তি করে অসাম্প্রদায়িকতার ভান করার জন্য প্রচুর মানুষ পাওয়া যায়।আবার এই ধর্মপ্রাণ মানুষেরাই মুহূর্তের মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা বোধ করে না। সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের জন্য এখানে মানুষের ছবি চাঁদে দেখার গুজব মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুকে ‘ধর্ম অবমাননা’র খবর রটিয়ে দিয়ে শত শত হিন্দুবাড়িতে আক্রমণ চালাতে দেখা যায়!

জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, নির্যাতন, প্রতিমা ভাঙচুর, লুটপাট, ভয় দেখানো ইত্যাদি আমাদের দেশে আগে থেকেই ছিল। কিন্তু অতীতে মূলত নির্বাচন, ভোটের রাজনীতি, ভূমি ও সম্পত্তি দখল, নারীদের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি ইত্যাদিই ছিল সংখ্যালঘু নির্যাতনের পেছনে মূল উপজীব্য। সে সময় মৌলবাদী উপায়ে সশস্ত্র হামলা করে সংখ্যালঘু নির্যাতন করা হতো।

ইদানীংকালে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতনে যুক্ত হয়েছে একটি নতুন মাত্রা। সেটি হচ্ছে-‘ইসলাম এবং নবী নিয়ে কটূক্তি করেছে’ এমন গুজব রটিয়ে সংখ্যালঘুদের উপর নারকীয় তাণ্ডব চালানো। বেশ ভালো একটা কৌশল অবলম্বন করছে নির্যাতনকারীরা। ফেসবুক, ব্লগ ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন গুজব-বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ফেসবুক এখন অনেক ধর্মীয় সংখ্যালঘুর নিঃস্ব হওয়ার কারণে পরিণত হয়েছে।

আমাদের দেশের মানুষ এখনও হুজুগে মাততে পছন্দ করে। ধর্ম অবমাননার হুজুগ তুলে সাম্প্রদায়িকতার উন্মত্ত নেশায় মাতোয়ারা হতে একশ্রেণির মানুষের উৎসাহের শেষ নেই। ফেসবুকের ইতিবাচক দিক অনেক। এক শ্রেণির মানুষ সেই ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ না করে ঝুঁকছে নেতিবাচকের দিকে। এ ব্যাপারে বিশেষ চিন্তা-ভাবনা করা দরকার।

আমাদের দেশে এখনও অনেক মানুষই ফেসবুক বা ব্লগের টেকনিক্যাল দিকগুলো ভালো বোঝেন না। অনেকে তো আরেকজনের সহযোগিতা নিয়ে ফেসবুক আইডি খোলেন, ফেসবুক ব্যবহার করেন। পাসওয়ার্ড পর্যন্ত নিজে জানেন না। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের অনেকেই ‘ট্যাগ’ কী জানেন না। ডিজিটাল জালিয়াতি ফটোশপ করে কীভাবে মিথ্যাকে সত্য রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয় সেটাও বোঝেন না।

রামুর উত্তম, নাসিরনগরের রসরাজ কিংবা গঙ্গাচরার টিটু রায়ের মত যে কেউ যে কোনো সময় নিশানা হতে পারেন। ফেসবুককে কেন্দ্র করে সংগঠিত এসব অপরাধ মোকাবেলা করতে হলে ফেসবুক সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর বিকল্প নেই। কেবল তথ্যপ্রযুক্তি আইন দিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।এর আগে আমরা নাসিরনগরের ঘটনায় পুলিশ, প্রশাসন, স্থানীয় আইনজীবী, হামলাকারীরা সবাইকে একই উন্মাদনায় একাট্টা হতে দেখেছি। সেখানে জামায়াত, বিএনপি, আওয়ামী লীগের আইনজীবীরা একাট্টা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন হামলাকারীদের পক্ষে।

যে কথাগুলো বহুজন বহুবার বহুভাবে বলেছে সেটা হলো, যদি ধর্ম অবমাননাকর অপরাধ কেউ করে থাকে তাহলে তার এই বিকৃত এবং ঘৃণ্য অপরাধের জন্য রাষ্ট্রীয় আইনে তার বিচার এবং সাজা হবে। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তার সাজা হবে। কিন্তু কারও ব্যক্তিগত অপরাধের কারণে এর মাশুল তার পুরো সম্প্রদায় এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিতে হবে কেন? এমন অবিচার ইসলাম এবং রাষ্ট্রীয় আইনি ব্যবস্থা-কোনোটার সঙ্গে যায় কি?

গঙ্গাচরায় বিক্ষোভ সভা-সমাবেশ করে রীতিমতো সাধারণ মানুষকে খেপিয়ে সহিংসতার ক্ষেত্র তৈরি করে সহিংসতা চালানো হয়। কথা হলো, এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকরী বাহিনী, গোয়েন্দা কী ভূমিকা পালন করেছেন? এই কী তাঁদের পেশাগত এবং রাষ্ট্রীয় কর্তব্য পালনের নমুনা?

বিজ্ঞানের উন্নতি হলে, সমাজ শিক্ষিত হলে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস, সাম্প্রদায়িকতা নিঃশেষিত হয়, এ ধারণা আমাদের দেশে যেন ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমান সময়ের শিক্ষা কেবল চাকরি পাওয়ার শিক্ষা। চাকরিটুকু পেলে সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকব, দামি বাড়ি, দামি আসবাব, ছেলেমেয়ের জন্য ইংলিশ মিডিয়াম, এর বাইরে অন্য কোনও ভাবনা নয়, শুধু ব্যক্তির নিজেরটুকু। আর এই সুখবোধের আনাচেকানাচে গড়ে উঠছে বিউটিপার্লার, শপিং মল, ফার্স্ট ফুড কর্নার। ভোগবাদী এই সমাজ আদর্শবাদের সব প্রতিমা বিসর্জন দিয়েছে।

শিক্ষা যেমন চাকরি পাবার মাধ্যম, ধর্ম তেমনই সামাজিক আধিপত্য ও রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের সিঁড়ি। বর্তমান সময়ে ধর্মে ধর্মে পূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধাশীলতা সম্ভব নয়। এখন জরুরি, কোনও ভাবে জোড়াতালি দিয়ে আপাত ঐক্য টিকিয়ে রাখা। না হলে একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে দাবানল ছড়িয়ে যেত না। আমরা-ওরার বিভাজন এত স্পষ্ট হয়ে উঠত না।

দ্রুত একটি ‘চতুর্থ মাত্রা’র নতুন শ্রেণি গড়ে উঠেছে। তথাকথিত উচ্চবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণির বাইরে এই নতুন সমাজ। বিগত চার দশক ধরে রাজনীতির জলহাওয়া পেয়ে এদের বাড়বাড়ন্ত। অর্ধশিক্ষিত বা পুরো অশিক্ষিত এই গোষ্ঠীটাই পার্টির প্রয়োজনে অস্ত্র সংগ্রহ করছে, ভোট লুট ও এলাকা দখল করে দলের প্রয়োজনীয় সম্পদ হয়ে উঠছে। চতুর্থ মাত্রার এই নতুন সমাজ আগে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতি করত। এখন তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে। বেপরোয়া চাঁদাবাজি, ভিজিডি-ভিজিএফ, বয়স্কভাতা, সরকারি অনুদান, বিভিন্ন প্রকল্পের টাকায় এরা লালিতপালিত হয়।

এক দিন যা শিশু উদ্ভিদ ছিল, এখন ডালপালা মেলে বিষবৃক্ষ হয়ে দেশের গ্রাম-মফস্বল ছেয়ে গেছে। পুরনো দিনের অভাব, দারিদ্র্য মুছে সামান্য অর্থের মুখ দেখে নির্ভয়ে এরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজনীতির কুরুক্ষেত্রে। আর ধর্মের জিগির তুলে মৌলবাদের ভিত শক্ত করছে। গত কয়েক বছরে যে কয়েকটি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে, রামু, নাসিরনগর, কিংবা গঙ্গাচরায়, প্রত্যেক ক্ষেত্রে মাঠে নেমেছে এই ‘ধর্মান্ধ সমাজ’। যারা এই চতুর্থ মাত্রার সমাজের অংশবিশেষ। যাদের আগ্রহে বেড়ে চলেছে এই নব্য ধারার সাম্প্রদায়িকতা। এ দিকে কারও কোনো দৃষ্টি নেই। যেন প্রয়োজনও নেই।

ধর্মীয় সংযম, ত্যাগ, অন্যকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এ সব দূরের গ্রহ, ধর্ম বলতে এখন যা দাঁড়িয়েছে এক জন হিন্দুকে সন্দেহের চোখে দেখা, তাদের খুঁত ধরা, নানাভাবে অপমান-অপদস্থ করা। বিভিন্ন মাহফিলে মাইকে তাদের ধর্ম-কৃষ্টি-কালচার নিয়ে ব্যঙ্গ করা হবে। নানাভাবে অপমান-অপদস্থের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হবে, এ সব সহ্য কর, নইলে ঝামেলা বেঁধে যাবে। মাঝে মাঝে গায়ের জোর দেখাতে হবে।

সামান্য ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে লাগিয়ে দিতে হবে হিন্দুদের বাড়িঘর-উপসনালয়-ব্যবসাকেন্দ্রে আগুন। চালানো হবে লুটপাট। এমন মাহেন্দ্রক্ষণেই তো রাজনীতি ঘোলা জলে মাছ ধরতে শুরু করে। ভোটের অংক, কোথায় ক’টি আসন, কোন সম্প্রদায়ের জোর বেশি, সে সব ভেবে পদক্ষেপ নেওয়া। তবে সে সব বলে কী লাভ? রাজনৈতিক দলগুলি কবে আর আত্মসমালোচনা করেছে?

তবু বিশ্বাস করি, হামলাকারী-লুণ্ঠনকারী সাম্প্রদায়িক জগতের বাইরে একটা জগৎ রয়েছে, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের জগৎ। অন্তত বাংলাদেশে। সমাজের সবাই, সবকিছু এখনও গলে পচে যায়নি। কিন্তু কোথায় তারা? কবে তারা গা-ঝাড়া দিয়ে উঠবেন? কবে দূর হবে সাম্প্রদায়িকতার ভূত? আর কতকাল ঘুমিয়ে থাকবেন? সাম্প্রদায়িক পশুত্বকে আর কতকাল লালন করা হবে? কত আর …!

চিররঞ্জন সরকার: লেখক, কলামিস্ট।

উৎস: পরিবর্তন ডটকম


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ